এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন শহর রাজশাহী গড়ে উঠছে পর্যটন নগরী
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩, ১৬:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট ভার্সন

সমুদ্রে কার ভাল না লাগে! সবাই এক বাক্য বলবে সাগরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সবাই উপভোগ করতে চায়, কিন্তু চাকরীর ব্যস্ততা আর যাওয়া হয় না। তারপরও অল্প সময়ে ঘুরে আসা যায় রাজশাহীর পদ্মার পাড় থেকে। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মার পাড় ঘেঁষে ঘুরে বেড়ানোর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটন কেন্দ্র।
৯৬ দশমিক ৭২ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট এই নগরীর বুক চিরে রয়েছে বেশকিছু প্রাচীন নিদর্শন। প্রমত্তা পদ্মার তীর ঘেঁষা এই শহরের প্রধান সৌন্দর্যই মূলত নদীকেন্দ্রীক। এছাড়া শহরজুড়ে অবস্থিত বিশেষায়িত স্থানও রয়েছে। আর এই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে রাসিকের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন সিটি হিসেবেই গড়ে উঠছে রাজশাহী।
দর্শনার্থীরা বলছেন, এমনিতেই দারুণ সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে রাজশাহীর পদ্মা নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা। তবে আরও কিছু সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হলে এটিই হয়ে উঠতে পারে রাজশাহীর প্রধান বিনোদন কেন্দ্র।
তবে এখনও অত্র এলাকায় পর্যটক ও দর্শনার্থীবান্ধব বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা জুঁই। তিনি বলেন, কোথাও বেড়াতে গেলে আশেপাশে খাবারের কোনো ভালো ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়। এখানে এখনও ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। এছাড়া বাঁধজুড়ে বেশ কয়েকটি বসার বেঞ্চ বানানো হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। এগুলো বাড়াতে হবে। নারী ও শিশুরা থাকলে কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়? একই সঙ্গে পদ্মার কিনারা জুড়ে যদি ভালো আবাসিক হোটেল থাকে, তাহলে রাজশাহীর বাইরে থেকে যারা আসবেন, তারা রাতে থাকতে পারবেন। এমন কিছু পরিকল্পনা নিয়ে স্থানগুলো সাজানো হলে এখানে একটি ভালো পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।
দিনাজপুর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন আবু সাঈদ তালুকদার। তিনি বন্ধুদের সাথে রাজশাহীর হাইটেক পার্ক আই বাঁধ এলাকায় বন্ধুদের সাথে এসেছেন। তিনি বলেন, রাজশাহী এসেছি পড়াশোনার জন্য। রাবি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে। বন্ধুদের কাছে শুনলাম এ বাঁধের কথা। তাই চলে এলাম। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে যে দারুণ পরিবেশ ও প্রকৃতি উপভোগ করলাম, সেটি সত্যিই দারুণ ছিল।
দর্শনার্থীদের এমন চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) তাদের সেবার পরিধি বাড়িয়ে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান রাসিক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
লিটন বলেন, শহরকে নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। রাজশাহী শহরে ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান করা সম্ভব না। তাই ঐতিহ্য ও সবুজায়নকে সমৃদ্ধ করে পর্যটন নগরী হিসেবে রাজশাহীকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। গত ৫ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পুরো নগরীর চিত্রই পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করেছি। রাজশাহীতে এখন টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে। তারা সেবা দিচ্ছে। নগরীর মোড়গুলো সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে রাজশাহীকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম চাকচিক্যের নগরী করে গড়ে তুলতে কাজ চলমান। আসন্ন নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে অসম্পূর্ণ কাজগুলোও করতে চাই।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চলমান। এরমধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। যে উন্নয়ন কাজে সৌন্দর্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
নগরীর বিমান চত্বর থেকে বিহাস পর্যন্ত নতুন ৪ লেন সড়ক, তালাইমারি থেকে আলুপট্টি পর্যন্ত ৪ লেন সড়ক, বিলসিমলা রেলক্রসিং মোড় থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত ৪ লেন সড়ক, ভদ্রা রেলক্রসিং থেকে নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ৪ লেন সড়ক, বিলসিমলা থেকে সিটি হাট পর্যন্ত ৪ লেন সড়ক, বুধপাড়া এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ, সপুরা থেকে পোস্টাল একাডেমি পর্যন্ত সড়ক, সাগরপাড়া বটতলা মোড় থেকে রুয়েটের সীমানা প্রাচীর, উপশহর মালোপাড়া-রাণীবাজার সড়ক, মনিচত্বর থেকে জাদুঘর মোড় সড়ক, বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক সংলগ্ন সড়কসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সকল সড়ক বর্ধিত ও উন্নয়ন করা হয়েছে। আর প্রশস্ত রাস্তাগুলোর মাঝে দৃষ্টিনন্দন আইল্যান্ড, ফুটপাতের সৌন্দর্যবর্ধণ কাজ, প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে বসার সুন্দর জায়গা তৈরিসহ দৃষ্টিনন্দন আলোকবাতি শুধু নগরবাসীকেই নয়; দেশি-বিদেশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করছে।
এছাড়াও নগরীর পদ্মার তীরবর্তী সবার পছন্দের সিঅ্যান্ডবি মোড়ে দেশের সবচেয়ে বড় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে। যার পাদদেশে বসার সুন্দর জায়গা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ আড্ডা দিচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করছে।
এদিকে, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণ কাজ শেষের দিকে। আগামী জুনেই উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার কাজও শেষে পথে। বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কের অবকাঠামো কাজ শেষে ডেকোরেশন কাজ চলমান। এরইমধ্যে সেখানে আধুনিক সিনেপ্লেক্স চালু হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু প্রতিষ্ঠান কাজও শুরু করেছে। এর সামনেই একটি দৃষ্টিনন্দন লেকও তৈরি হচেছ। এতে নগরীর প্রায় সকল মোড়ই পর্যটন স্পটের মতো গড়ে উঠছে।
রাসিকের তথ্যে আরও জানা যায়, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ১৭০ কিলোমিটার কার্পেটিং রাস্তা, ১৭৭ কিলোমিটার সিসি রাস্তা, ১৮৫ কিলোমিটার ড্রেন ও ৭০ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ৯টি ড্রেনের পাশে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। আর এই রাস্তাগুলোর পাশে সুন্দর বসার জায়গা, বৃক্ষরোপণ রাস্তাগুলো সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। এছাড়া নির্মিত ফ্লাইওভারকে কেন্দ্র করে পর্যটন স্পট গড়ে উঠেছে। যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা জমছে। এছাড়া সপুরা মটপুকুর, ভদ্রা পারিজাত লেক ও কালীপুকুর, লালন শাহ্ পার্ক সহ পদ্মাপাড়ের বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। রাত-দিন সব সময় এখানে দর্শনার্থী থাকছে।
পর্যটনের এই সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়েই পদ্মাপাড়ে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ ‘নোঙর’। নোঙরের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। শুধু নোঙরই নয়; নগরীতে গত দুই বছরে অনেক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটক আসছেন।
এবি/ওজি
