যারা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছেন?

এক. নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৪ দল ছাড়াও সমমনা অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বাম-ফ্রণ্টসহ যে রাজনৈতিক দলগুলো গতবার নির্বাচন করেনি কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও ধারাবাহিক সংলাপ করবেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনা হবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গেও।এসব আলোচনা থেকে প্রধানমন্ত্রী ধারণা নিবেন, তারা নির্বাচনে কি ধরনের সুযোগ সুবিধা বা কি ধরনের পরিবেশ চায়। সেই অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে বিএনপির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক সংলাপে যাবেন না আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় যাবেন না প্রধানমন্ত্রী।বিএনপির সঙ্গে সংলাপ না করলেও বর্তমানে দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকা কর্নেল অলি আহমেদ এর এলডিপি, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম এর নেতৃত্বাধীন কল্যাণ পার্টি- এরকম কিছু দলের সঙ্গে সংলাপ করবে আওয়ামী লীগ। এমনকি ইসলামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত হেফাজতে ইসলামসহ আরও কিছু ইসলামপন্থী দলের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সংলাপ করবে।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তো বলেই ফেলেছেন, শিগগিরই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং সেখানে তিনি থাকবেন। তবে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো চূড়ান্ত করেননি। আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই আওয়ামী লীগের এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে।আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পরপরই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের লক্ষ্যে সরকারের চার দফা পদক্ষেপের মধ্যে আছে:

দুই. সংলাপের মাধ্যমে যে সুপারিশগুলো হবে, সেই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে নির্বাচন তফসিল ঘোষণার আগে বা আগের এক সপ্তাহ মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেবেন। ভাষণে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অঙ্গীকার করবেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকার কেন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সরকার কীভাবে নির্বাচনকে বিশেষায়িত করবে-তার একগুচ্ছ বিবরণ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তাছাড়া সকল দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ গতবার মন্ত্রিসভায় ছিলেন, তেমন সাফল্য না থাকা সত্ত্বেও এবারও তাঁকে রাখা হবে। নির্বাচনের পরপরই পাঠ্যপুস্তক প্রদানের বিষয়টি থাকায় মন্ত্রিসভায় রাখা হবে শিক্ষামন্ত্রীকে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মন্ত্রিসভায় থাকবেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। জাসদ থেকে মঈনুদ্দিন খান বাদলকে (বিভক্ত জাসদের একটা অংশ) মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। জাতীয় পার্টির একাধিক নেতার মধ্যে রওশন এরশাদও থাকতে পারেন মন্ত্রিসভায়। ইয়াফেস ওসমান ও মোস্তফা জব্বার, আওয়ামী লীগ এই দু’জন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী আছেন। সংবিধান অনুযায়ী এক-দশমাংশ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী রাখার কথা থাকলেও এই দুজনের আসার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনে আসা দলগুলোর মধ্যে থেকে কাউকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা হতে পারে।

তিন. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সাক্ষাৎ করে মন্ত্রিসভার আকার ছোট করা হবে। জানা গেছে, ১০-১২ জনের মন্ত্রিসভা হতে পারে। এখানে একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী থাকবেন। বর্তমান সিনিয়র মন্ত্রীদের নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। এছাড়া কিছু নতুন মুখও আসতে পারে। এছাড়া অধিকাংশ মন্ত্রীকেই তখন পদত্যাগ করতে হবে।
আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্বাচন করবেন না, সেহেতু তিনি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকবেন। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী গতবারও অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও তিনি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকবেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও গতবার অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও থাকছেন তিনি। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গতবার অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও তাঁকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে।

অপরদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এ. কে. এম শাহজাহান কামাল, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক সহ বেশ কিছু সিনিয়র মন্ত্রীদের এবার নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। গতবার নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম থাকলেও এবার তাঁকে রাখা নাও হতে পারে। মন্ত্রিসভার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী এখনো চূড়ান্ত করেন নি। তবে যেসব মন্ত্রীর দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাদেরকে রেখে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র।চার. মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি সংলাপের আয়োজন করবেন প্রধানমন্ত্রী। যদি দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না, তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করবেন প্রধানমন্ত্রী।